ইসকন কি? ইসকনের ইতিহাস, উদ্দেশ্য ও প্রতিষ্ঠাতা - বিস্তারিত জানুন
বর্তমানে সারা বিশ্বে কৃষ্ণ নাম প্রচারের জন্য যে সংস্থাটি সবচেয়ে বেশি কাজ করছে, তার নাম হলো ইসকন। অনেকেই ইসকনের নাম শুনেছেন, কিন্তু এর আসল অর্থ বা উদ্দেশ্য জানেন না। আজ আমরা সহজ ভাষায় ইসকন সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।
#### ইসকন (ISKCON) শব্দের অর্থ কি?
ISKCON একটি ইংরেজি শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। এর পূর্ণরূপ হলো -
*I = International*
*S = Society for*
*K = Krishna*
*CON = Consciousness*
অর্থাৎ *International Society for Krishna Consciousness*। এর বাংলা অর্থ হলো *আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ*। সংক্ষেপে একে ইসকন বলা হয়।
সহজ করে বললে, এটি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে কৃষ্ণ চেতনা জাগ্রত করা এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
#### ইসকন কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
এর পিছনে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য দেবের একটি ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। মহাপ্রভু বলেছিলেন,
> "পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম।
> সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম।।"
এর অর্থ হলো পৃথিবীর প্রতিটি গ্রামে ও শহরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম প্রচার হবে। এই বাণীকে সত্যি করার জন্যই ইসকনের সৃষ্টি।
মহাপ্রভু তাঁর দুই প্রিয় পার্ষদ নিত্যানন্দ প্রভু ও হরিদাস ঠাকুরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন -
> "শুন শুন নিত্যানন্দ, শুন হরিদাস।
> সর্বত্র আমার আজ্ঞা করহ প্রকাশ।
> প্রতি ঘরে ঘরে গিয়া কর এই ভিক্ষা।
> বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, কর কৃষ্ণ শিক্ষা।।"
অর্থাৎ প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে মানুষকে কৃষ্ণ নাম জপ করতে বলো। ইসকনের ভক্তরা এই নির্দেশকেই তাদের জীবনের মূল ব্রত হিসেবে পালন করেন।
#### ইসকনের ৭টি প্রধান উদ্দেশ্য
ইসকন শুধু একটি মন্দির নয়, এর ৭টি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে যা শ্রীল প্রভুপাদ নিজে লিখে গেছেন।
*১. ভগবত তত্ত্বজ্ঞান প্রচার:* মানব সমাজের মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে ভগবান সম্পর্কে জ্ঞান প্রচার করা, যাতে মানুষ জীবনের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারে এবং সমাজে শান্তি ফিরে আসে।
*২. গীতা ও ভাগবতের শিক্ষা:* শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতম এর আদর্শ অনুযায়ী কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করা।
*৩. মানুষকে একত্রিত করা:* সমস্ত মানুষকে একে অপরের কাছে এবং শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিয়ে আসা। প্রতিটি জীবই যে কৃষ্ণের অংশ, এই উপলব্ধি করানো।
*৪. সংকীর্তন আন্দোলন:* মহাপ্রভু প্রবর্তিত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের সংকীর্তন আন্দোলন সম্পর্কে সবাইকে জানানো এবং উৎসাহিত করা।
*৫. পবিত্র স্থান নির্মাণ:* ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলার জন্য পবিত্র মন্দির নির্মাণ করা, যেখানে সবাই শান্তিতে ভগবানের সেবা করতে পারবে।
*৬. সরল জীবনযাপন:* সদস্যদের একটি সরল ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের শিক্ষা দেওয়া।
*৭. গ্রন্থ প্রচার:* এই উদ্দেশ্যগুলো পূরণ করার জন্য বিভিন্ন বই, পত্রিকা ও গ্রন্থ প্রকাশ ও বিতরণ করা।
#### ইসকন কিভাবে পরিচালিত হয়?
ইসকন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। সারা বিশ্বে এর ৬০০ টিরও বেশি মন্দির ও কেন্দ্র রয়েছে।
প্রতিটি মন্দিরের প্রধানকে বলা হয় *Temple President* বা মন্দিরের অধ্যক্ষ। তিনি মন্দিরের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন।
এতগুলো মন্দির সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সারা বিশ্বকে প্রায় ৩০ টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের দায়িত্বে থাকেন একজন *GBC (Governing Body Commissioner)*। তিনি সেই অঞ্চলের সমস্ত মন্দির দেখাশোনা করেন, আধ্যাত্মিক মান ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করেন।
সমস্ত GBC-দের নিয়ে একটি বোর্ড তৈরি হয়, যার নাম *GBC Body*। এটিই ইসকনের সর্বোচ্চ পরিচালনা পর্ষদ। প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গের মায়াপুরে বিশ্বের সব GBC একত্রিত হন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেন। সেখানে ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
#### ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা কে?
ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন *অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ*। ভক্তরা তাঁকে সংক্ষেপে শ্রীল প্রভুপাদ বলে ডাকেন।
তাঁকে বিভিন্ন উপাধি দেওয়া হয়েছে - চিন্ময় জগতের দূত, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সেনাপতি। মাত্র ৭০ বছর বয়সে তিনি আমেরিকায় গিয়ে এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন, হাতে মাত্র ৪০ টাকা নিয়ে।
তিনি বলেছিলেন, GBC-দের *Watch Dog* বা পাহারাদার কুকুরের মতো সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ইসকনে কোনো ভুল দর্শন প্রবেশ করতে না পারে। তিনি আরও বলেছিলেন, "নেতা মানেই হলো শ্রবণ-কীর্তনের নেতা"। অর্থাৎ নেতা শুধু পরিচালনা করবেন না, নিজেও জপ-কীর্তনে আদর্শ হবেন।
শ্রীল প্রভুপাদের তিরোধানের পর ইসকনে কোনো একক নেতা নেই। তাঁর নির্দেশ ছিল, তাঁর সমস্ত শিষ্য একসাথে মিলে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে -
> "যেই ভজে, সেই বড়, অভক্ত হীন ছাড়।
> কৃষ্ণ ভজনে নাই জাতি কুলাদি বিচার।।"
অর্থাৎ যে কৃষ্ণকে ভজনা করে, সেই বড়। কৃষ্ণ ভজনায় জাতি, ধর্ম, নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। এটিই ইসকনের মূল শিক্ষা।
ইসকন কি? ইসকনের অর্থ, উদ্দেশ্য ও প্রতিষ্ঠাতা | What is ISKCON in Bengali

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thank you visit again