কাটোয়া কার্তিক পুজো ২০২৬ কবে? কাটোয়ার কার্তিক লড়াই এর ইতিহাস, সময় ও ঠাকার গল্প

 katwa-kartik-pujo-2026-date-kartik-lorai


কাটোয়া মানে শুধু একটি শহর নয়, কাটোয়া মানে আবেগ। দুর্গা পুজো শেষ হলেই পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া শহর প্রস্তুতি নিতে থাকে বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবের জন্য - কার্তিক পুজো এবং বিখ্যাত কার্তিক লড়াই। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বাঁশবেড়িয়া, চুঁচুড়া, বেলডাঙার সাথে সাথে কাটোয়ার কার্তিক পুজো সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয়।

 কাটোয়া কার্তিক পুজো ২০২৬ কবে?


বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী কার্তিক পুজো হয় কার্তিক সংক্রান্তিতে। ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ২০২৬ সালে কার্তিক সংক্রান্তি পড়েছে ১৭ই নভেম্বর, মঙ্গলবার।


কাটোয়া কার্তিক পুজো ২০২৬ - ১৭ নভেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার


-কাটোয়া কার্তিক লড়াই ২০২৬ - ১৮ নভেম্বর ২০২৬,


পুজোর পরের দিনই হয় সেই ঐতিহ্যবাহী লড়াই বা শোভাযাত্রা। কাটোয়া ও পাশের শহর দাঁইহাটে দুই দিন ধরে এই শোভাযাত্রা চলে।

কাটোয়া কার্তিক লড়াই কি? লড়াই নাম কেন?


অনেকেই ভাবে লড়াই মানে মারামারি। আসলে তা নয়। এই লড়াই হলো সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের প্রতিযোগিতা।


Katwa kartik lorai



আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক ড. স্বপন কুমার ঠাকুরের মত অনুযায়ী, ১৮শ শতাব্দীতে কাটোয়াতে যখন জমিদারি প্রথা ছিল, তখন বিভিন্ন জমিদারদের মধ্যে ঠাকুর বিসর্জন নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো। কার ঠাকুর আগে যাবে, কার ঠাকা সবচেয়ে সুন্দর। তখন বিশ্রামের জন্য ঠাকুরগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড় করানো হতো। সেখানে বিনোদনের জন্য জমিদারদের লেঠেল বা লাঠিয়ালদের মধ্যে লাঠি খেলা হতো। সেখান থেকেই নাম হয়েছে "কার্তিক লড়াই"।


অন্য আরেকটি মত হলো, আগে বাবুসমাজের বাবুরা ও বারবনিতারা সন্তান কামনায় কার্তিক পুজো করতেন। তাদের মধ্যে কে কার চেয়ে বড় করে পুজো করবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা থেকেই লড়াই কথাটা এসেছে। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত এই লাঠি খেলার লড়াই হতো, এখন সেটা একটি বিশাল শোভাযাত্রায় পরিণত হয়েছে।


 ঠাকা কি? - কাটোয়া কার্তিক পুজোর প্রাণ


কাটোয়া কার্তিক পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণ হলো । ঠাকা ছাড়া কাটোয়া ভাবাই যায় না।


ঠাকা হলো একটি ত্রিভুজ আকৃতি বাঁশের কাঠামো। প্রথম দিকের তাঁতি সম্প্রদায় এই ঠাকা বানানো শুরু করেন। একটি ঠাকার মধ্যে ২০ থেকে ৩১ টি পর্যন্ত ছোট ছোট কার্তিকের মূর্তি থাকে। প্রতিটি মূর্তির ভঙ্গি, রূপ আলাদা। কোনটা জামাই কার্তিক, কোনটা রাজা কার্তিক, কোনটা অর্জুন কার্তিক। এই রূপগুলো রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনী থেকে নেওয়া।


আগে বেহারারা কাঁধে করে ১৫-২০ ফুট লম্বা এই ঠাকা বয়ে নিয়ে যেত, পান চিবোতে চিবোতে। এখন লোহার চাকা লাগানো গাড়িতে করে ঠাকা নিয়ে যাওয়া হয়। ঠাকা দেখার জন্য রাস্তার দুই ধারে হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়। এটাকে "ঠাকা পুজো" ও বলা হয়।


কাটোয়ার ৩ প্রাচীন কার্তিক পুজো


কাটোয়ায় ৩০০ বছর ধরে পুজো হয়ে আসছে। তার মধ্যে ৩ টে পুজো সবচেয়ে প্রাচীন বলে মানা হয়:


১. হরিসভা পাড়ার ল্যাংটো কার্তিক: এটা কাটোয়ার সবচেয়ে ফেমাস। এখানে কার্তিকের কোন জামা থাকে না, তাই ল্যাংটো কার্তিক নাম। সন্তান লাভের আশায় বহু মানুষ এখানে মানত করেন।


২. ছুতোর পাড়ার বাংরা কার্তিক: এই কার্তিকের বিশাল আকার ও আলাদা রূপ আছে।


৩. তাঁতি পাড়ার সাত ভাই কার্তিক: তন্তুবায় সম্প্রদায়ের শুরু করা এই পুজো ৭ ভাইকে নিয়ে হয়।


এছাড়াও ঝামাটপুরের ধুমো কার্তিক, উন্নয়ন সমিতির জামাই কার্তিক, ভরতপুরের গজা কার্তিক ও খুব জনপ্রিয়।


### কার্তিক লড়াই কিভাবে হয়?


পুজোর দিন রাত থেকে শুরু হয় আলোকসজ্জা। পরের দিন সন্ধ্যা বেলা থেকে শুরু হয় মূল আকর্ষণ - লড়াই।


প্রতিটি পুজো কমিটি তাদের বিশাল ঠাকা ও বড় কার্তিক মূর্তি নিয়ে কাটোয়ার রাস্তায় বের হয়। কাটোয়া স্টেশন রোড, কলেজ রোড, হাসপাতাল রোড হয়ে সার্কাস ময়দানে সব ঠাকুর জড়ো হয়। সেখানে প্রতিটি ঠাকুরকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দর্শকদের দেখানো হয়। দর্শকরাই বিচারক। কার ঠাকা সবচেয়ে সুন্দর, কার আলোর কাজ ভালো, কার থিম ভালো - তা নিয়ে আলোচনা চলে।


এখন একটি ঠাকা বানাতে ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কয়েক লাখ টাকার LED লাইট ও থিম প্যান্ডেল থাকে। পুরো কাটোয়া শহরকে বিয়ের বাড়ির মতো সাজানো হয়।


### কিভাবে যাবে কাটোয়া?


কাটোয়া যেতে চাইলে হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে কাটোয়া লোকাল ধরতে পারো। হাওড়া থেকে কাটোয়া যেতে সময় লাগে প্রায় ৩.৫ ঘন্টা। লড়াইয়ের দিন প্রচুর ভিড় হয়, তাই সকাল সকাল পৌঁছে যাওয়া ভালো। কাটোয়াতে থাকার জন্য কিছু লজও আছে।


### শেষ কথা


কাটোয়া কার্তিক পুজো শুধু একটি পুজো নয়, এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি। ৩০০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য আজও সমান ভাবে জীবন্ত। বাবু সমাজ থেকে শুরু হওয়া এই পুজো আজ সার্বজনীন। তুমি যদি একবার কার্তিক লড়াই দেখো, সারাজীবন মনে থাকবে।


২০২৬ এর ১৮ নভেম্বর তারিখটা ক্যালেন্ডারে মার্ক করে রাখো। এবারের কার্তিক লড়াই মিস করো না।

Post a Comment

Thank you visit again

নবীনতর পূর্বতন