পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার
পশ্চিমবঙ্গে 34 বছরের বাম শাসন এবং তারপর 15 বছরের তৃণমূল শাসনের পর প্রথমবার ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সরকার গঠন করেছে। 23 ও 29 এপ্রিল 2026 এ দুই দফায় ভোট এবং 4 মে ফল ঘোষণার পর 9 মে 2026 ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। নতুন সরকারের 100 দিনের মধ্যে যে বড় পরিবর্তনগুলো দেখা যাচ্ছে তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
1. প্রশাসনিক পরিবর্তন
নবান্নে প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক 11 মে 2026 এ হয়। প্রথম দিনেই মুখ্যমন্ত্রী তিনটি বড় ঘোষণা করেন।
প্রথমত, রাজ্যের সমস্ত নিয়োগে দুর্নীতির তদন্তের জন্য SIT গঠন করা হয়েছে। SSC, প্রাইমারি TET এবং পুরসভা নিয়োগ নিয়ে আলাদা কমিশন কাজ শুরু করেছে।
দ্বিতীয়ত, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফেরাতে পুলিশের রদবদল করা হয়েছে। কলকাতা ও হাওড়ার পুলিশ কমিশনার সহ 50 জনের বেশি IPS অফিসারের বদলি হয়েছে।
তৃতীয়ত, নবান্নে প্রতিদিন সকাল 10 টায় সমস্ত দপ্তরের সচিবদের নিয়ে রিভিউ মিটিং চালু হয়েছে।
2. মহিলা সুরক্ষা ও আইনে কড়াকড়ি
বিজেপি সরকারের প্রথম ক্যাবিনেটেই মহিলাদের উপর অত্যাচার নিয়ে তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সন্দেশখালি সহ বিভিন্ন ঘটনার তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশন তৈরি হয়েছে।
নতুন সরকার ঘোষণা করেছে, রাজ্যে মহিলা সুরক্ষা বাহিনী তৈরি করা হবে। স্কুল-কলেজের 500 মিটারের মধ্যে ইভটিজিং রুখতে বিশেষ টিম থাকবে।
3. শিক্ষা ও চাকরিতে পরিবর্তন
শিক্ষা ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে 25,000 শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করা হয়েছে।
এছাড়া, রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে রাজ্যপালের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক করার জন্য কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
4. শিল্প ও বিনিয়োগ
মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেওয়ার পরেই বলেছিলেন, বাংলাকে আবার গড়তে হবে। শিল্পে জোর দিতে প্রথম 30 দিনের মধ্যে তাজপুর গভীর সমুদ্র বন্দর এবং দেউচা-পাঁচামি কয়লা খনি প্রকল্পের কাজ দ্রুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের সহযোগিতায় পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরে দুটি নতুন শিল্প করিডর তৈরির প্রস্তাব পাশ হয়েছে।
5. কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন
আগের সরকারের সময় যে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো নিয়ে টানাপোড়েন ছিল, সেগুলো নতুন সরকার পুরোদমে চালু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় নতুন করে 10 লক্ষ বাড়ির তালিকা তৈরি হয়েছে।
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প রাজ্যে পুরোপুরি চালু হয়েছে। আগে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ছিল, এখন দুটি কার্ডই চলবে।
PM-KISAN এর টাকা কৃষকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ঢুকতে শুরু করেছে।
6. দুর্নীতি দমনে কড়া পদক্ষেপ
নতুন মন্ত্রিসভায় 19 জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী, 3 জন প্রতিমন্ত্রী এবং 19 জন প্রতিমন্ত্রী সহ মোট 41 জন সদস্য রয়েছেন। মন্ত্রীদের সম্পত্তির হিসাব প্রতি বছর অনলাইনে দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে।
রেশন, বালি, গরু পাচার সহ সমস্ত ক্ষেত্রে তদন্তে রাজ্য সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানানো হয়েছে।
7. সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন
দুর্গাপুজোর অনুদান 85,000 টাকা থেকে বাড়িয়ে 1 লক্ষ টাকা করার পাশাপাশি রামনবমী ও ছট পুজোতেও সরকারি অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে।
অযোধ্যার ধাঁচে নবদ্বীপ ও গঙ্গাসাগরে পর্যটন উন্নয়নে কেন্দ্রের প্রসাদ প্রকল্পের টাকা ব্যবহার করা হচ্ছে।
8. সাধারণ মানুষের জন্য নতুন প্রকল্প
লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প বন্ধ করা হয়নি, বরং নাম বদলে অন্নপূর্ণা ভান্ডার করা হয়েছে এবং টাকা 1000 থেকে বাড়িয়ে 1500 করা হয়েছে।
কন্যাশ্রী ও রূপশ্রী প্রকল্প চলবে, তার সঙ্গে কেন্দ্রের Beti Bachao প্রকল্পের সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
চা বাগানের শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি 250 থেকে বাড়িয়ে 350 টাকা করার প্রস্তাব পাশ হয়েছে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বিজেপি সরকার প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের উপর বেশি জোর দিচ্ছে। পরিবর্তন কতটা কার্যকর হবে তা আগামী 1-2 বছরে বোঝা যাবে, তবে এটা নিশ্চিত যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এটি একটি ঐতিহাসিক পালাবদল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thank you visit again