গ্রামের ইতিকথা - বটকৃষ্ণপুর থেকে আজকের বাওড়া
*বাওড়া গ্রামের ইতিকথা - হারিয়ে যাওয়া বটকৃষ্ণপুরের অজানা ইতিহাস*
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে অনেক গ্রামের নামের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের গল্প। তেমনই একটি প্রাচীন গ্রাম হলো বাওড়া। বর্তমানে আমরা যাকে বাওড়া নামে চিনি, লোকমুখে শোনা যায় তার পূর্ব নাম ছিল বটকৃষ্ণপুর। এই তথ্যকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক যুক্তি।
*নামের উৎপত্তি - বাওড় শব্দের অর্থ কি?*
প্রাচীন গ্রামটি গড়ে উঠেছিল অজয় নদীর তীরবর্তী এক পতিত এলাকায়। অভিধান অনুযায়ী 'বাওড়' শব্দের অর্থ হলো নদীর তীরবর্তী পতিত বা জলা জমি, যা বর্ষায় ডুবে যায় এবং শীতকালে ফসল ফলানোর উপযোগী হয়। অজয় নদের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলে এমন অনেক বাওড়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই থেকেই এই জনপদের নাম হয় বাওড়া।
অন্যদিকে আরেকটি মত অনুযায়ী, এখানে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল 'বাউর' সম্প্রদায়। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে 'বাউর' শব্দটি এসেছে বাতুল > বাউল > বাউর থেকে। বাতুল শব্দের অর্থ যারা বাচাল, সংসার ধর্ম পালন করেও ভবঘুরের মতো গান গেয়ে বেড়ায়। এই বাউল-বাউর সম্প্রদায়ই এই পতিত অঞ্চলে প্রথম ঘর বাঁধে। তাদের নাম থেকেই গ্রামের নাম হয় বাউরা, যা পরে অপভ্রংশ হয়ে বাওড়া হয়েছে।
*বাঘঘণে পুকুর ও রায় জমিদারদের ইতিহাস*
এককালে এই অঞ্চলটি চৈতন্যপুরের রায় জমিদারদের অধীনে ছিল। লোককথা অনুযায়ী, এই জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় তখন বাঘেরও বাস ছিল। তার নিদর্শন হিসেবে আজও গ্রামের উত্তরে 'বাঘঘণে' নামে একটি প্রাচীন মজা পুকুর রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বাঘ যেখানে ঘন ঘন জল খেতে আসত, সেই থেকেই নামটি এসেছে।
*দশ শতকের সামাজিক বিপ্লব ও বাউরদের উৎখাত*
ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো দশ শতকের আশেপাশের সময়। তখন বাংলায় পাল শাসনের শেষ পর্যায়ে চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অরাজকতা চলছিল। সেই সময় এই বাউর সম্প্রদায় গোঁড়া হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাদের সহজ-সরল জীবনযাপন এবং উদার ধর্মমত অনেক মুসলমানকেও আকৃষ্ট করে। পাশ্ববর্তী পিন্ডিরা গ্রামের কিছু মুসলিম শিষ্য এই বাউরা গ্রামে এসে গোদার পাড় নামক স্থানে আশ্রয় নেয়। এখানে আজও 'গোদারপার' নামক একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই মুসলিম-আসক্তি গোঁড়া হিন্দু জমিদার রায় সাহেব মেনে নিতে পারেননি। তিনি বাউরদের উৎখাত করে পিন্ডিরার রায়তদের এখানে বসান।
*বটকৃষ্ণপুর নামের রহস্য*
তথাকথিত আছে, পাশ্ববর্তী শ্যামনগর বা শ্যামবাজার থেকে একজন বৈষ্ণব ভক্ত এসে একটি বিশাল বটগাছের নিচে প্রথম বসতি স্থাপন করেন। সেই বটগাছকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণ ভজনা শুরু হয়। তৎকালীন নায়েব এই অঞ্চলের নাম দেন বটকৃষ্ণপুর - বট ও কৃষ্ণের সমন্বয়ে। পরবর্তীকালে বাউর সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে রায় জমিদাররা ব্রাহ্মণদের এখানে নিয়ে আসেন।
তখন গ্রামের মধ্যে চট্টরাজ, মুখোপাধ্যায়, চক্রবর্তী, বন্দ্যোপাধ্যায়, ভট্টাচার্য, রায় প্রভৃতি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়কে জমি দান করে বসতি স্থাপন করানো হয়। সেই থেকেই বাওড়া একটি ব্রাহ্মণ প্রধান গ্রামে পরিণত হয়।
*বিংশ শতাব্দীতে নতুন জনবসতি*
ব্রাহ্মণদের পর ধীরে ধীরে গ্রামে অন্যান্য সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে কর্মকার, সদগোপ (ঘোষ), সামন্ত (পাল), লাহা (লায়েক) প্রভৃতি শ্রেণির মানুষ এখানে বসতি স্থাপন করেন। এরপর সর্দার (বাউরি), বাগদি (ধীবর), মাঝি সম্প্রদায়ের মানুষজনও গ্রামের প্রান্তে বসবাস শুরু করেন।
দুঃখের বিষয়, তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় এই শ্রেণির মানুষদের অস্পৃশ্য বলে মনে করা হতো। কথিত আছে, হাঁড়ি সম্প্রদায়ের কাউকে স্পর্শ করলে বা তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করলে গঙ্গাস্নান করতে হতো। তাই তাদের গ্রামের বাইরে স্থান দেওয়া হয়েছিল। যদিও আজ সেই কুসংস্কার অনেকটাই দূর হয়েছে।
*উপসংহার*
আজ বটকৃষ্ণপুর নামটি আর প্রচলিত নেই, কিন্তু বাওড়া নামটি তার বাউর সম্প্রদায়ের স্মৃতি, অজয় নদের বাওড় অঞ্চল এবং বটগাছের ইতিহাসকে নিয়ে স্বমহিমায় ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। বটকৃষ্ণপুর থেকে বাওড়া - এই নাম পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত !
"Bawra gramer itihas"
Baura gramer itihas
Botokrishnapur to bowrah
Baura
Baura pindira 713143
New pin code 713132
Baura
Katwa Burdwan
Ketugram 271

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thank you visit again