মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন ফের ছড়িয়ে পড়ল। প্রায় এক মাস শান্ত থাকার পর মঙ্গলবার রাতে ফের মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়াল আমেরিকা ও ইরান।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, তারা ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরে ৫টি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস করেছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাব দিয়েছে তেহরান। ইরানের তরফে জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
*কেন ট্যাঙ্কারগুলিতে হামলা চালাল আমেরিকা?*
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা CENTCOM একটি ভিডিও প্রকাশ করে জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) পরপর দুইবার মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই হামলা এড়াতে সক্ষম হয়। এই ঘটনায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি।
এই হামলার প্রতিশোধ নিতেই মঙ্গলবার পাল্টা অভিযান চালায় আমেরিকা। CENTCOM জানিয়েছে, তারা মোট ৫টি জাহাজকে অকেজো করেছে। এর মধ্যে ৪টি জাহাজ - M/T Kaviz, M/T Charminar, M/T Horizon 1 এবং M/T Riesco - ওমান উপসাগরে ছিল এবং একটি জাহাজ M/T Derya ইরানের খার্গ দ্বীপের কাছে অবস্থান করছিল।
মার্কিন বাহিনীর দাবি, হামলা চালানোর আগে মানবিক কারণে জাহাজের সমস্ত নাবিককে নিরাপদে জাহাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারপরই জাহাজগুলিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
এই বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান যতবার মার্কিন জাহাজে হামলার চেষ্টা করবে, ততবার তাদের তেল ট্যাঙ্কার হারাতে হবে।
*জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, আকাশেই ধ্বংস ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র*
আমেরিকার এই হামলার পরেই বুধবার ভোরে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে IRGC জানিয়েছে, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই ঘাঁটিটি মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে থাকে।
তবে জর্ডান সরকার জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টিকেই তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশে থাকতেই ধ্বংস করে দিয়েছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন মরুভূমি এলাকায় গিয়ে পড়ে। ফলে কোনো প্রাণহানি হয়নি। একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন যে, জর্ডানে থাকা সমস্ত মার্কিন সেনা সুরক্ষিত আছেন এবং হামলা কার্যকর হয়নি।
এর পাশাপাশি ইরান আরও দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালীতে ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ইরানের মতে, এই জাহাজগুলি নিষিদ্ধ এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল। এই ১০টি জাহাজের মধ্যে ২টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং ৮টি বাণিজ্যিক তেল ট্যাঙ্কার রয়েছে।
*হরমুজ প্রণালী বন্ধ, তেলের দামে রেকর্ড বৃদ্ধি*
বর্তমানে এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ, যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। ইরান এই প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে এবং সেখানে তাদের নৌবাহিনীর টহল বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে আমেরিকা ইরানের খার্গ দ্বীপ সহ প্রধান বন্দরগুলিতে নৌ-অবরোধ জারি করেছে, যাতে ইরান তেল রপ্তানি করতে না পারে। এটি একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ৯৯.৪৯ ডলার প্রতি ব্যারেল হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই সংঘর্ষ আরও বাড়ে, তাহলে তেলের দাম ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের বাজারেও।
ইরান ইতিমধ্যেই কুয়েত ও বাহরাইনের কাছে থাকা বিদেশি ট্যাঙ্কারগুলিকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং বলেছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে এলে তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
*ছয় মাসের যুদ্ধ কোন দিকে যাচ্ছে?*
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এই সংঘাত গত ছয় মাস ধরে চলছে। মাঝে এক মাস শান্তি থাকলেও মঙ্গলবারের হামলা ফের সবকিছু এলোমেলো করে দিল। এর মধ্যেই ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের একাধিক শহরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে খবর।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রশাসন এখন ইরানের উপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে। সামরিক হামলার পাশাপাশি মঙ্গলবারই ইরানের বিমান শিল্পের উপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে।
পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, জাতিসংঘ বা অন্য কোনো দেশ এই উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতা করে কিনা।
US Iran War News
Iran Oil Tanker Attack
Jordan US Base Attack
Hormuz Strait Closed
Oil Price Today 2026

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thank you visit again